
মো. সেলিম উদ্দিন খাঁন
কয়েক সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রামে লাগামহীনভাবে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। বন্যাকে কারণ হিসেবে দেখালেও সবজি থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, ডিম ও মুরগি—প্রায় সব পণ্যের দামই এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বাজারে ৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি মিলছে না। এ পরিস্থিতিতে বাজারে নিয়মিত তদারকি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন ক্রেতারা। সবজির চড়া দামের মধ্যেই এবার সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম। একই সঙ্গে ফার্মের ডিমের দাম ডজনে ৩০ টাকা বেড়ে ১৫০ টাকায় উঠেছে। মাছ, পেঁয়াজ, আদা ও রসুনের বাজারেও রয়েছে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা।
ব্যবসায়ীরা বন্যা ও টানা বৃষ্টিতে উৎপাদন ও সরবরাহ কমে যাওয়াকে দাম বাড়ার কারণ হিসেবে দেখালেও ভোক্তাদের অভিযোগ, দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। বাজারে কার্যকর তদারকি না থাকায় বাড়তি দামের চাপ শেষ পর্যন্ত পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
জুলাইয়ে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভারী বৃষ্টিপাতের পর থেকেই সবজির বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়। ওই সময় কাঁচামরিচের দাম খুচরা বাজারে কেজিতে ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। পরে ভারত থেকে কাঁচামরিচ আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও আমদানিকৃত পণ্য বাজারে আসার পরও চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে এর সুফল দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন বাজারে ২৫০ গ্রাম কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়।
নগরীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ঝিঙা ও ঢ্যাঁড়শ ৮০ টাকা, কাকরোল ১০০, ধুন্দল ও কচুরলতি ৮০ থেকে ১০০, শসা ৬০ এবং বরবটি ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতাদের দাবি, সরবরাহ সংকটের কারণে গত দুই সপ্তাহে বেশির ভাগ সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
এক সপ্তাহে ডিম ৩০, ব্রয়লার ২৫ টাকা বেশি
চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগেও একই ডজন ডিমের দাম ছিল প্রায় ১২০ টাকা। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে ডজনে দাম বেড়েছে ৩০ টাকা।
ব্রয়লার মুরগির দামও এক সপ্তাহে কেজিতে ২৫ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার ১৯০ থেকে ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে দাম ছিল প্রায় ১৮০ টাকা। সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৪০ থেকে ৩৭০ টাকা, লেয়ার ৩৩০ থেকে ৩৪০ এবং দেশি মুরগি ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকা কেজি দরে। এ ছাড়া গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮০০ এবং খাসির মাংস ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই
সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও বাজারদরে তার প্রভাব পড়েনি। বরং চাহিদার কারণে কয়েক ধরনের মাছের দাম আরও বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গত সপ্তাহের তুলনায় রুই, কাতলা, পাবদা ও তেলাপিয়াসহ কয়েক ধরনের মাছের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বর্তমানে ছোট রুই ৩৫০ থেকে ৪০০, মাঝারি রুই ৪০০ থেকে ৪৮০, ছোট কাতলা ৩২০ থেকে ৪০০, পাঙাশ প্রায় ২২০, বাগদা চিংড়ি ৮০০ থেকে ১ হাজার, বড় পোয়া ৪৫০ থেকে ৫০০, তেলাপিয়া ২২০ থেকে ২৮০, চাষের পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ এবং হাওরের পাবদা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়।
মসলা পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী ,নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলার বাজারেও স্বস্তি নেই। চট্টগ্রামের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজ ৪৩, আদা ৯৫ এবং রসুন ১১৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে এসব পণ্যের দাম পাইকারির তুলনায় আরও ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি।
বেসরকারি চাকরিজীবী আজগর আলী বলেন, প্রতিদিনই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে। বন্যার প্রভাবের কথা বলে বাজারে দাম বাড়ানো হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও দাম কমছে না। এক সপ্তাহেই ডিমের ডজন ৩০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগির কেজি ২৫ টাকা বেড়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
ক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, দেশে বন্যাসহ নানা সংকটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়ান। কিন্তু একবার দাম বাড়লে পরে আর কমতে দেখা যায় না। বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত তদারকি ও অভিযান জোরদার করা দরকার।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বন্যাকে ভোক্তাদের পকেট কাটার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। দুর্যোগের সুযোগে নানা অজুহাতে বাজারে সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। বন্যার প্রভাব মূলত সবজির উৎপাদন ও সরবরাহে পড়লেও মাছ, মাংস, ডিমসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয়েছে।