
মো. সেলিম উদ্দিন খাঁন
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় অনুকূল আবহাওয়া ও পরিচর্যার কারণে পানের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে পানের কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় চাষিদের মাঝে হাহাকার ও হতাশা বিরাজ করছে। উৎপাদনে ভালো ফলন হলেও বরজ তৈরির উচ্চমূল্যের উপকরণ, সার, কীটনাশক এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় পানের দাম কম হওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় পানচাষিরা। অনুসন্ধানে জানা যায়- পেকুয়ার পাহাড়ঘেঁষা শিলখালী, বারবাকিয়া ও টইটং ইউনিয়নের বিস্তৃত পাহাড়ি ঢালু এলাকায় উৎপাদিত মিষ্টি পান ও গাছ পানের দেশজুড়ে রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। বিশেষ করে শিলখালীর জারুলবুনিয়া ও কাচারি মুড়া এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই পান চাষের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক অতিবর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় ধসে বিস্তীর্ণ বরজ মাটি চাপা পড়ে বিনষ্ট হওয়ায় সর্বস্ব হারিয়েছেন স্থানীয় চাষিরা। সরবরাহের ঘাটতিতে বাজারে এক বিড়া পানের দাম ১০০-১৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২৫০ টাকায় পৌঁছালেও বরজ হারানো ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের ভাগ্যে জুটছে না কোনো সুফল।
বরজ পুনর্নির্মাণে আর্থিক সংগতি না থাকায় কৃষকরা এনজিওর চড়া সুদের ঋণের জালে আটকে পড়ছেন। পাশাপাশি রিজার্ভ পাহাড়ি জমিতে বরজ করার অজুহাতে বন বিভাগের স্থানীয় কর্মচারীদের বার্ষিক চাঁদা দিতে হয়, যা দিতে দেরি হলে বা না দিলে বরজ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে সরকারিভাবে কোনো কৃষি প্রণোদনা বা কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা না থাকায় চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন এ অঞ্চলের হাজারও পানচাষি।
রোগবালাই, বিপুল খরচ ও আয়ের বাস্তবতা
স্থানীয় চাষিদের মতে, একটি পানের বরজ পচনের হাত থেকে রক্ষা করতে ও উৎপাদন বজায় রাখতে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ ওষুধ ও শ্রম দিতে হয়। পানের বরজে মূলত জালে পচা রোগ, পানের পুঞ্জা, যক্ষ্মারোগ ও হালিনাগীর আক্রমণ বেশি দেখা যায়।
মাসে প্রায় ৫ বার ২ হাজার টাকার বিষ প্রয়োগ করতে হয়। মাসে দুবার ১ হাজার টাকা করে ভিটামিন এবং টিএসপি, সাদা সার ও গোবর বাবদ মাসে প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ হয়। সপ্তাহে পান তুলতে এবং তা সুন্দর করে সাজাতে ৮ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, যাদের মাসিক মজুরি দৈনন্দিন হিসাব বাবদ যায় প্রায় ৮ হাজার টাকা। মাসে চারবার পান তোলা যায়। প্রতিবারে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা হিসাবে মাসে সর্বমোট প্রায় ২৪ হাজার টাকার পান বিক্রি হয়। উচ্চ উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি ও এনজিওর কিস্তি মেটানোর পর চাষিদের হাতে আর কোনো উদ্বৃত্ত থাকে না। জারুলবুনিয়ার ৫০ বছর বয়সী ক্ষতিগ্রস্ত পানচাষি মোহাম্মদ বেলাল আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি ১০ বছর বয়স থেকে বাবার সঙ্গে পান চাষ করে আসছি। কিন্তু এই দীর্ঘ জীবনে কোনো দিন সরকার থেকে আমাদের পানের বরজে এসে অনুদান দিতে দেখিনি।
আমরা কোনো সরকারি কৃষিঋণও পাই না। কম সুদে ব্যাংক লোন পেলে আমাদের এনজিওর চড়া সুদের কিস্তি নিতে হতো না।’ পানচাষি মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন সংরক্ষণের অভাব ও রপ্তানি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘রাজশাহীর পান সহজে পচে না বলে তা সৌদি আরবসহ বিদেশে রপ্তানি হয়। কিন্তু আমাদের পেকুয়ার সুস্বাদু মিষ্টি পান ফ্রিজে রাখলেও পচে যায়। পচন রোধে পান কীভাবে আধুনিক প্যাকেজিং ও হিমায়িত উপায়ে সংরক্ষণ করতে হয়, তা হলে আমরা এত ক্ষতির মুখে পড়তাম না। আমরা যখন সৌদি আরবে যেতাম, ব্যাগে করে নিয়ে যাওয়া এখানকার এক বিড়া মিষ্টি পান সেখানে ২০০ রিয়ালে বিক্রি করেছি। সরকার যদি পেকুয়ার পান বিদেশে রপ্তানির সরকারি ব্যবস্থা করত এবং আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যদি এলাকার সন্তান হিসেবে এই খাতে নজর দিতেন, তবে এ অঞ্চলের চাষিরা অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারতেন।’ প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও পেকুয়ার শিলখালী ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে সপ্তাহে লাখ লাখ টাকার পান বেচাকেনা চলে। জারুলবুনিয়া পানবাজার প্রতি মঙ্গলবার সকালে বসে, এখানে দিনে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার পান বিক্রি হয়। কাছারি মুড়া স্টেশন পানবাজারে প্রতি শুক্রবার সকালে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার পান বিক্রি হয়। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট ও রাজধানী ঢাকার বড় বড় পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসে এসব হাট থেকে উন্নত মানের মিষ্টি পান ও গাছ পান কিনে সারা দেশে সরবরাহ করেন। তবে পর্যাপ্ত যোগাযোগব্যবস্থা ও নিবেদিত পান সংরক্ষণাগার না থাকায় পরিবহনকালেও প্রচুর পান পচে নষ্ট হয়ে যায়।
এ বিষয়ে পেকুয়া উপজেলা কৃষি অফিসার মোহাম্মদ ফারুক হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘কৃষি দপ্তরের ব্লক পর্যায়ের উপসহকারী কর্মকর্তারা নিয়মিত পানচাষিদের দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে পানচাষিদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দিতে আমরা শিগগিরই একটি বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করব। সেখানে কীভাবে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পান চাষ করলে এবং নির্দিষ্ট মাত্রায় বিষ প্রয়োগ করলে তা বিদেশে রপ্তানি উপযোগী হবে, সে বিষয়ে ধারণা দেওয়া হবে। চাষিদের প্রণোদনা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এই পান রপ্তানির পথ সুগম করতে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করব।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, কোনো ডিপার্টমেন্ট বা সংশ্লিষ্ট কেউ যদি পানচাষিদের টাকার জন্য চাপ দেয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত পানচাষিদের তালিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।