সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৪ অপরাহ্ন

আনোয়ারায় দখলদার সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় চট্টগ্রাম দক্ষিন সড়ক বিভাগ

  • প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম

৭৭ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ থমকে, বারবার উচ্ছেদের পরও পুনর্দখল—নেপথ্যে কারা? উচ্ছেদ হয়, কিন্তু দখলদারিত্ব বন্ধ হয় না’।

৩৪ ফুট সড়ক কোথাও নেমে এসেছে ৭-৮ ফুটে। শুধু দোকান নয়, সড়কেই গড়ে উঠেছে অটোরিকশার স্ট্যান্ড

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চাতরী চৌমুহনী বাজার থেকে মেরিন একাডেমি পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কের ৭৭ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ শুরু হলেও চাতরী চৌমুহনী বাজার এলাকায় অবৈধ দখল ও যানজটের কারণে কাজের কাঙ্ক্ষিত গতি মিলছে না। সড়কের দুই পাশ দখল করে গড়ে উঠেছে শতাধিক অস্থায়ী দোকানপাট। পাশাপাশি সড়কের জায়গা দখল করে বসেছে সিএনজিচালিত ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড। ফলে ব্যস্ত এই মহাসড়কের একটি অংশ কার্যত বাজারের দখলে চলে যাওয়ায় প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে তীব্র যানজট।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—প্রশাসন ও সড়ক বিভাগের পক্ষ থেকে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই একই জায়গায় আবার দোকানপাট ও স্ট্যান্ড গড়ে উঠছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, কারা বারবার এসব স্থাপনা বসানোর সুযোগ দিচ্ছে? উচ্ছেদের পর সরকারি জায়গা পুনরায় দখল হচ্ছে কীভাবে? আর বছরের পর বছর ধরে চলা এ দখলদারিত্বের পেছনে থাকা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কেন হচ্ছে না?

চলতি বছরের শুরুতে চাতরী চৌমুহনী বাজার থেকে মেরিন একাডেমি পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। মেরিন একাডেমি, বন্দর সেন্টারসহ বিভিন্ন এলাকায় কাজ এগোলেও চাতরী চৌমুহনী বাজার অংশে দখল ও যানজট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সড়ক উন্নয়নকাজ নির্বিঘ্ন করতে গত এপ্রিলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালায়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের এক সপ্তাহ না যেতেই উচ্ছেদ করা জায়গায় ফের দোকান বসতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে গড়ে ওঠে শতাধিক অস্থায়ী স্থাপনা।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, উচ্ছেদ অভিযানে সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করার পর সেই জায়গা পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব কার? উচ্ছেদের পর পুনরায় দখল হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা বা জরিমানা হয়েছে কি না, তা নিয়েও রয়েছে অস্পষ্টতা।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, চাতরী চৌমুহনী বাজারের মূল সড়কটি প্রায় ৩৪ ফুট প্রশস্ত। কিন্তু দুই পাশের দখলের কারণে কোনো কোনো স্থানে যানবাহন ও পথচারী চলাচলের জন্য মাত্র ৭ থেকে ৮ ফুট জায়গা অবশিষ্ট রয়েছে।

ফলে দুই দিক থেকে গাড়ি এলে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। বিশেষ করে সকাল ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষসহ সাধারণ যাত্রীদেরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে।

একদিকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে মহাসড়ক উন্নয়ন করা হচ্ছে, অন্যদিকে উন্নয়নকাজের সুফল পাওয়ার আগেই সড়কের জায়গা দখল হয়ে যাওয়ায় পুরো প্রকল্পের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের জায়গা দখলের সঙ্গে দোকানপাটের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে সিএনজিচালিত ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড। সড়কের পাশে যাত্রী ওঠানামা এবং গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখায় যান চলাচলের জায়গা আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, মহাসড়কের জায়গায় এ ধরনের স্ট্যান্ড পরিচালনার অনুমতি কে দিয়েছে? নিয়মিতভাবে এসব স্ট্যান্ড থেকে কারা সুবিধা পাচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না—এ বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

উচ্ছেদ হয়, কিন্তু দখলদারিত্ব বন্ধ হয় না। চাতরী চৌমুহনীর বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সমস্যাটি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে উচ্ছেদ অভিযান ও দখলমুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।

তাদের অভিযোগ, অভিযান পরিচালনার সময় কিছু দোকান সরিয়ে দেওয়া হলেও পরে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় আবার দোকান বসে। ফলে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও অস্থায়ী দখলদারের মধ্যে পার্থক্য তৈরি না করে শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

এখানে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—অভিযানের আগে অবৈধ স্থাপনার তালিকা করা হলেও উচ্ছেদের পর সেই তালিকা অনুযায়ী নজরদারি থাকে কি না। যদি না থাকে, তাহলে একই জায়গায় পুনরায় স্থাপনা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

বাজারের ইজারা ব্যবস্থাও বড় প্রশ্ন

আনোয়ারা পেশাজীবি মহলের বেশ ক’জন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানালেন, চাতরী চৌমুহনী বাজারের নিজস্ব স্থায়ী জায়গা নেই। সিইউএফএল সার কারখানার জমির ওপর বাজারটি প্রতিষ্ঠিত হলেও নিজস্ব জায়গার সংকটের কারণে সড়কের জায়গা দখল করে বাজার পরিচালিত হচ্ছে।

এ অবস্থায় বাজার ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়াটিও নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। কারণ, একদিকে সরকারি সড়কের জায়গা দখলমুক্ত করার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে বাজারকেন্দ্রিক ইজারা বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলতে থাকলে সেই জায়গায় আবার দোকান বসানোর অর্থনৈতিক প্রণোদনা থেকেই যাচ্ছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন—যে বাজারের স্থায়ী জায়গা নেই, সেই বাজারের ইজারা দিয়ে কি প্রশাসন পরোক্ষভাবে সড়কের জায়গায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম টিকিয়ে রাখছে?

এ প্রশ্নের জবাব না মিললে উচ্ছেদ অভিযান যতবারই পরিচালিত হোক, সমস্যার মূল কারণ থেকেই যাবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের পাশে একটি দোকানের জায়গা পাওয়া শুধু জীবিকার বিষয় নয়; কোথাও কোথাও এটি অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। দোকান বসানো, জায়গা নিয়ন্ত্রণ, অটোরিকশা দাঁড় করানো কিংবা বিভিন্ন ধরনের চাঁদা আদায়ের অভিযোগও স্থানীয় পর্যায়ে শোনা যায়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সরকারি জায়গা বারবার দখল হয়ে যাওয়া এবং উচ্ছেদের পরও একই স্থানে দ্রুত স্থাপনা ফিরে আসা একটি সংগঠিত ব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দেয় কি না, সেটি তদন্তের দাবি রাখে।

দক্ষিণ চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিটু চাকমা বলেছেন, অবৈধ দখলদারদের কারণে চাতরী চৌমুহনী এলাকায় সড়ক উন্নয়নকাজে গতি আনা যাচ্ছে না। উন্নয়নকাজ পরিচালনার সময় অবৈধ সিন্ডিকেটের কাছে তাদের লোকজন বারবার হেনস্তার শিকার হচ্ছেন বলেও তিনি জানিয়েছেন।

এ বক্তব্য থেকেই সমস্যাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসেসড়কের মালিকানা ও উন্নয়ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব সড়ক বিভাগের হলেও অবৈধ দখল উচ্ছেদের ক্ষেত্রে তাদের একক ক্ষমতা সীমিত।

অর্থাৎ সড়ক বিভাগ উচ্ছেদ অভিযান চালালেও স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পৌরসভা/স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বাজার ইজারাদাতা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সমন্বয় ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ফল পাওয়া কঠিন। এই সমন্বয়ের ঘাটতিই কি পুনর্দখলের অন্যতম কারণএ প্রশ্নও উঠছে।

দখলমুক্ত করার পর সরকারি জায়গা রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি না থাকলে উচ্ছেদ অভিযান অনেকটা ‘এক দিনের কর্মসূচি’তে পরিণত হয়। চাতরী চৌমুহনীর ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

একটি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পর কয়েক দিনের মধ্যে যদি একই জায়গায় নতুন দোকান বসে, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি শুধু অবৈধ দোকান উচ্ছেদের নয়; পুনর্দখল প্রতিরোধের ব্যবস্থাপনা নেই বা তা কার্যকর নয়।

এ জন্য উচ্ছেদের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিত করা, সড়কের জায়গায় স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা বা নিরাপদ নকশা তৈরি, নিয়মিত মোবাইল টহল ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং পুনর্দখলকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সড়ক দখলের পাশাপাশি চাতরী চৌমুহনী বাজারে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও নাজুক। নির্মাণাধীন ড্রেনে নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা ফেলার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও ড্রেনের ওপরও অস্থায়ী স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

বৃষ্টির পানি ও ময়লা জমে অনেক ড্রেনের পানি কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

স্থানীয়রা বলছেন, জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন বাড়তে পারে। ফলে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে নোংরা পরিবেশ ও অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের কারণে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও রয়েছে।

বাজারে বর্জ্য ফেলার জন্য নির্দিষ্ট স্থান আছে কি না, থাকলে নিয়মিত তা অপসারণ করা হয় কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বাজার ব্যবস্থাপনা, ইজারাদার, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন স্পষ্ট না হলে ড্রেনে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা বন্ধ করা কঠিন। ফলে সড়ক দখলের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন।

৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রকল্পের আওতাধীন গুরুত্বপূর্ণ বাজার অংশ যদি দখল ও যানজটে আটকে থাকে, তাহলে বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

আরও বড় বিষয় হলো, নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও যদি সড়কের জায়গা পুনরায় দখল হয়ে যায়, তাহলে উন্নয়ন প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

অর্থাৎ এখনই দখলমুক্ত ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করা গেলে কয়েক বছর পর একই সমস্যা নতুন করে দেখা দিতে পারে।

চাতরী চৌমুহনীর সেলিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘সরকার জনভোগান্তি দূর করতে এবং এলাকার উন্নয়নে ৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে জাতীয় মহাসড়কের উন্নয়নকাজ করছে। এই উন্নয়নকাজ কি বাজারের অবৈধ ব্যবসায়ীদের জন্য? অবৈধ দোকানদারদের কারণে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা অসহায় হয়ে পড়েছেন।’

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। নামমাত্র অভিযান হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার স্থাপনা গড়ে ওঠে। বাজারের ড্রেনের পানি ময়লা-আবর্জনায় দূষিত হয়ে পড়েছে। এতে রোগবালাই ও ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে। দ্রুত বাজার ও সড়ক অবৈধ দখলমুক্ত করার দাবি জানান তিনি।

সচেতন নাগরিকদের মতে, চাতরী চৌমুহনী বাজারের সমস্যা কেবল অবৈধ দোকান উচ্ছেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনা, ইজারা, সড়ক দখল, অটোরিকশা স্ট্যান্ড, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেন দখল, যানজট, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং পুনর্দখল প্রতিরোধের মতো একাধিক বিষয়।

তাদের মতে, প্রথমে বাজার ও সড়কের সরকারি জমির সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর অবৈধ স্থাপনার তালিকা তৈরি করে উচ্ছেদ করতে হবে। একই সঙ্গে পুনরায় যাতে কেউ দখল করতে না পারে, সে জন্য স্থায়ী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বাজারের যদি সত্যিই নিজস্ব জায়গা না থাকে, তাহলে বিকল্প জায়গা নির্ধারণের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। শুধু উচ্ছেদ করে শত শত ব্যবসায়ীকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিলে সমস্যাটি অন্য জায়গায় গিয়ে পুনরায় তৈরি হতে পারে।

চাতরী চৌমুহনীতে বারবার দখল ফিরে আসার ঘটনায় স্থানীয়দের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে একটি ‘সিন্ডিকেট’। কিন্তু এই সিন্ডিকেটে কারা রয়েছে, কীভাবে তারা দোকান বসানোর সুযোগ দেয়, জায়গা নিয়ন্ত্রণ বা অর্থনৈতিক লেনদেনের কোনো ব্যবস্থা আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্যেও ‘অবৈধ সিন্ডিকেটের’ কাছে কর্মীদের হেনস্তার অভিযোগ এসেছে। ফলে বিষয়টি নিছক অবৈধ দোকান স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রশাসনিকভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

সরকারি জায়গা উচ্ছেদের পর সাত দিনের মধ্যে পুনরায় দখল হলে কারা সেই জায়গা বরাদ্দ দিচ্ছে বা বসার সুযোগ করে দিচ্ছে—এই একটি প্রশ্নের উত্তর বের করা গেলেই সমস্যার বড় একটি অংশের রহস্য উন্মোচিত হতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মতে, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার—

চাতরী চৌমুহনী বাজারের সড়ক ও সরকারি জমির সীমানা চিহ্নিত করা, অবৈধ স্থাপনার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে উচ্ছেদ, উচ্ছেদের পর নিয়মিত নজরদারি ও পুনর্দখল ঠেকাতে ব্যবস্থা গ্রহন, সড়কের ওপর ও পাশে অটোরিকশা স্ট্যান্ড বন্ধ বা নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তর, বাজার ইজারা ব্যবস্থার বৈধতা ও শর্ত পর্যালোচনা, বাজারের স্থায়ী বিকল্প স্থান নির্ধারণের উদ্যোগ, ড্রেন দখলমুক্ত ও নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, বাজারে নির্দিষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু, নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা, যানজট নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার, উচ্ছেদে বাধা বা সরকারি কাজে হেনস্তার অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা, সড়ক বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে স্থায়ী মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা।

চাতরী চৌমুহনীতে ৭৭ কোটি টাকার মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প এখন একটি বড় পরীক্ষার মুখে। সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করে সড়ক উন্নয়ন করছে, অথচ সেই সড়কের জায়গাই যদি আবার অবৈধ দখলে চলে যায়, তাহলে পুরো বিনিয়োগের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগপথকে যানজট, দখল ও অব্যবস্থাপনা থেকে মুক্ত করতে হলে শুধু একবারের উচ্ছেদ অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দখলের নেপথ্যে থাকা স্বার্থসংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করা, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূর করা এবং উচ্ছেদের পর সরকারি জমি রক্ষায় স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।

এখন দেখার বিষয়—প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাময়িক উচ্ছেদের পথেই থাকবে, নাকি চাতরী চৌমুহনীর দীর্ঘদিনের দখল-যানজট-অব্যবস্থাপনার পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধানের পথে এগোবে।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews