
টেকনাফ প্রতিনিধি
মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পথ এখনো অনিশ্চিত। সংকটের নবম বছরেও নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হওয়ায় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকটের পাশাপাশি পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরপর কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতি। বর্তমানে এসব ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চলমান থাকলেও স্থায়ী সমাধান হিসেবে প্রত্যাবাসনকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রত্যাবাসন এখনো অনিশ্চিত- বাংলাদেশ শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি আসছে না।
রোহিঙ্গা নেতাদের একটি অংশের দাবি, নিরাপত্তা, নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে তারা নিজ দেশে ফিরতে আগ্রহী নয়।
পরিবেশে বাড়ছে চাপ- দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের কারণে টেকনাফ ও উখিয়ার পাহাড়, বনাঞ্চল ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ক্যাম্প এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পাহাড় কাটার ঝুঁকি, বনভূমির ওপর চাপ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা উপস্থিতির কারণে এলাকার পরিবেশ, কৃষি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ছে। পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চললে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ- ক্যাম্প এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মাদক পাচার, মানবপাচারসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রের তৎপরতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
এদিকে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়াগামী হওয়ার প্রবণতাও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবপাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাত্রার ঘটনা নিয়েও সতর্ক করে আসছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
স্থানীয়দের ওপর প্রভাব- রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব শুধু ক্যাম্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। টেকনাফ ও উখিয়ার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বাজার, শ্রমবাজার, পরিবেশ ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হয়েছে বলে তাদের দাবি।
স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি আশ্রয়দাতা এলাকার উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান নির্ভর করছে নিরাপদ ও কার্যকর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর।